বাংলাদেশে গত কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণ ও ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে বন্যার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অন্তত ১০টি জেলায় এই বন্যার প্রকোপ দেখা দিয়েছে, যার ফলে প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার সংকটের কারণে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোর অনেক তথ্য এখনও পর্যন্ত অজানা।
বন্যায় আটজনের মৃত্যু ও আরও নিখোঁজ
বন্যার কারণে এ পর্যন্ত আটজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। কুমিল্লায় চারজন, কক্সবাজারে দুজন, ফেনীতে একজন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন মারা গেছেন। কক্সবাজারের রামুতে স্রোতে ভেসে যাওয়া চারজনের মধ্যে দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হলেও বাকি দুজন এখনও নিখোঁজ। কুমিল্লায় বন্যার পানিতে ডুবে দুজন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একজন এবং মাথায় গাছ পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ব্যক্তিরা হলেন নাঙ্গলকোট পৌরসভার দাউদপুর এলাকার বাসিন্দা কেরামত আলী (৪৫), কুমিল্লা নগরের ছোট এলাকার কিশোর রাফি (১৫) এবং চৌদ্দগ্রাম উপজেলার সোনাকাটিয়া গ্রামের শাহাদাত হোসেন (৩৪)। লাকসামে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুর নাম-পরিচয় এখনও জানা যায়নি।
গ্রামের পর গ্রাম তলিয়ে গেছে পানিতে
ফেনী সদরের বিভিন্ন এলাকা সম্পূর্ণ পানির নিচে চলে গেছে। দক্ষিণ মাইজবাড়িয়া, হাফেজিয়া মাদ্রাসা, এবং ভাঙ্গা তাকিয়া সহ একাধিক গ্রামে বাড়িঘর তলিয়ে গেছে। মানুষজন পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন, কেউ কেউ কলাগাছ দিয়ে ভেলা বানিয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ বুকপানিতে সাঁতরে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। মাইজবাড়িয়া এলাকায় সুফিয়া বেগম নামের এক নারীকে গাছ ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, যাকে পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার করেন।
নোয়াখালী ও কুমিল্লার পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে
টানা বর্ষণের ফলে নোয়াখালীর আটটি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, নাঙ্গলকোট, এবং মনোহরগঞ্জে প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। বন্যার পানি ফসলি জমি, পুকুর, এবং রাস্তাঘাট সবকিছু তলিয়ে দিয়েছে। কুমিল্লায় একদিনেই ২২০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
বন্যার্তদের উদ্ধার ও সহায়তায় সেনাবাহিনীর তৎপরতা
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, চট্টগ্রামের মিরসরাই, কুমিল্লার বুড়িচং, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ এবং মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় বন্যাকবলিত মানুষদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৭, ২৪, এবং ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের সেনাসদস্যরা পানিবন্দী মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন এবং ত্রাণ বিতরণ করছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ছয় হাজার বন্যাদুর্গত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
সরকারের পদক্ষেপ ও পরিস্থিতি মোকাবিলা
সরকার বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা শিগগিরই বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে যাবেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াবেন।
এমতাবস্থায়, সকলকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নিচু এলাকার মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে সকলের সহযোগিতা এবং সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
মুক্তপ্রকাশ, ২৩ আগস্ট ২০২৪
প্রতিবেদক: রাকিবুল ইসলাম রাহাত

0 Comments